সোমবার সকালে রাজধানীর কাজীপাড়া বাজারের এক দোকানে ছোলার দাম শুনে আঁতকে ওঠেন তিনি। প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১০৫ টাকা! একই অবস্থা হয় সবজির দোকানে গিয়ে লম্বা বেগুনের দাম শুনে। দুই দিনের ব্যবধানে ৪০ টাকার এক কেজি বেগুন উঠেছে ১০০ টাকায়।
দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে এত দিন যাঁরা খোঁজ রাখেননি গতকাল দাম শুনে তাঁদের এমন আঁতকে ওঠা স্বাভাবিক। গত দুই-
আড়াই মাসে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে রোজার মাসে যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে, সেগুলোর দাম বেড়েছে বেশি। গতকাল বেগুন ও ছোলা ছিল যেন ভিআইপি। ফলে রোজা শুরুর আগের দিন বাজারে গিয়ে চাপে পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষ।
আলাপকালে সিদ্দিকুর রহমান স্ত্রীর দেওয়া বাজারের ফর্দ দেখান। সেখানে ১৫টি পণ্যের তালিকা ও কেনার পরিমাণ রয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোজার আগের মাস দু-একের মধ্যে ওই ১৫টির মধ্যে নয়টি পণ্যের দাম বেড়েছে।
ঢাকার বাজারে সম্প্রতি চিনির দাম বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের ডালের দামও চড়া। রসুনে স্বস্তি নেই। মাছ ও মাংস কিনতে গেলে পকেট কাটা যাচ্ছে। বেগুনের মতো শসা, কাঁচা মরিচের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে চাল, আটা, সয়াবিন তেল, ভারতীয় পেঁয়াজ ও আদার দাম বাড়েনি। কিছু ক্ষেত্রে কমেছে।
রাজধানীতে গত শুক্রবার থেকে কাঁচাবাজারে রোজার কেনাকাটা বেড়েছে। মাসের শুরু হওয়ায় এই চাপ আরও বেশি। চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রেতারাও বাড়তি দাম আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
কারওয়ান বাজারে গতকাল মানভেদে প্রতি কেজি ছোলার দাম চাওয়া হয় ৮৫ থেকে ১০০ টাকা। শনিবারও পণ্যটির দাম কেজিতে এর চেয়ে ৫ টাকা বেশি ছিল। গতকাল সকালে সরকারি একটি সংস্থা বাজারে অভিযান চালানোয় দাম ৫ টাকা কমিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে কাজীপাড়া, হাতিরপুল ও মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন মানের ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০ টাকা, ১০০ টাকা ও ১০৫ টাকায়।
তিন মাস আগে এসব বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৬০-৬৫ টাকা। এরপর দাম বাড়তে শুরু করে। অন্যান্য ডালের দামও বেড়েছে। সরু দানার মসুর ডাল এখন প্রতি কেজি ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১১০ টাকা। মার্চের শুরুতে মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা ছিল।
নিম্ন আয়ের মানুষ চাপে পড়েছে অ্যাংকর ডাল ও খেসারির ডালের দাম বেড়ে যাওয়ায়। মাস খানেক আগে অ্যাংকর ডাল ১০-১২ টাকা বেড়ে ৬০-৬২ টাকায় উঠেছে। খেসারির ডাল কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। বুটের ডালের বেসন গত রমজান মাসের তুলনায় ৪০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা ও অ্যাংকর ডালের বেসন ২০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা বলছে, গত ১ মার্চ প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৮-৫০ টাকা। এখন ৬২-৬৫ টাকা।
বাজারে দেশি পেঁয়াজ আকারভেদে ৪২ থেকে ৫০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজ ২৮ থেকে ৩৫ টাকা। তবে চীনা রসুন ২২০ টাকা। এক বছর চীনা রসুনের দাম ১২১ শতাংশ বেড়েছে বলে তথ্য টিসিবির। বেড়েছে দেশি রসুনের দামও। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশি রসুন ৮০ টাকার কাছাকাছি ছিল। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৫০ টাকা দরে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. মামুন বলেন, তাঁর দোকানে আদা সস্তা, কেজি ৭০-৮০ টাকা। ভারতীয় পেঁয়াজের দাম গত তিন দিনে কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়েছে।
গরুর মাংস নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও সম্প্রতি এ দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু হাতিরপুল বাজারে গতকাল তা ছিল ৪৫০ টাকা। হাতিরপুলের বিক্রেতারা বললেন, সিটি করপোরেশনের দর আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হবে।
ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। গতকাল কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি ১৭৫ টাকা, কাজীপাড়া ও হাতিরপুলে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা।
মাছের দাম মান, আকার ও বাজারভেদে ভিন্ন ভিন্ন। তবে সব মাছের দামই বেড়েছে। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাজারে এক কেজি টেংরা, শিং, দেশি মাগুর, বেলে, বোয়াল, চিংড়ি, আইড় ইত্যাদি কিনতে গেলে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা দিতে হবে। এক কেজি বা এর কাছাকাছি একটি ইলিশের দাম ১০০০-১২০০ টাকা।
বাধ্য হয়ে সীমিত আয়ের মানুষের নজর থাকে চাষের রুই-কাতলা, কই, তেলাপিয়া, পাঙাশ ও নলা মাছের দিকে। রোজার বাজারের বাড়তি চাপে এসব মাছের দামও কেজিতে ২০-৪০ টাকা বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। যেমন চাষের কই ১৬০-১৮০ টাকার মধ্যে মিলত। এখন ১৮০-২২০ টাকা।
শসার দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৫০-৬০ টাকায় উঠেছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।
কাজীপাড়া বাজারে দেখা হওয়া সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, একটি পরিবারের বাজারের ব্যয়ের মধ্যে বেশি খরচ হয় মাছ-মাংস ও তরিতরকারির পেছনে। এসব পণ্যের দামে তো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

No comments:
Post a Comment